আওয়ামী লীগের ৪৮ শতাংশ ভোটার এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক জনমত জরিপে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণের এক চমকপ্ৰদ তথ্য।জরিপের ফলাফল অনুযায়ী অতীতে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন তাদের একটি বিশাল অংশ অর্থাৎ ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার এবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে বিএনপিতে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় প্রেসক্লাবে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এই জরিপের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জরিপের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সিআরএফ-এর স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এবারের নির্বাচনে ভোট প্রদানের প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে ৮ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন অথবা ভোট কেন্দ্ৰে যাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত নন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের ৬৪টি জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনের মোট ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। দুই ধাপে সম্পন্ন এই জরিপ কার্যক্রমটি চলে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
জাকারিয়া পলাশ জানান, জরিপের তথ্যমতে আওয়ামী লীগের পুরোনো ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন। এ ছাড়া, ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাকি ১৩ শতাংশ ভোটার অন্য কোনো দলকে বেছে নেবেন এবং ২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি ।২০০৮ সালের পর যারা প্রথমবারের মতো ভোটার হয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক পছন্দ নিয়েও জরিপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এরপরই রয়েছে বিএনপি, যাদের সমর্থন করছেন ২৭ শতাংশ নতুন ভোটার। এনসিপিকে ভোট দেবেন ১৭ শতাংশ এবং ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ নতুন ভোটার এখনো তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিশ্চিত নন।
ভোটারদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ‘দুর্নীতি’ সবচেয়ে বড় ইস্যু হিসেবে কাজ করছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা প্রার্থীর সততা এবং দুর্নীতিমুক্ত থাকার বিষয়টিকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবেন।
অন্যদিকে, ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। এর পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অবকাঠামগত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও ভোটারদের বিবেচনায় প্রাধান্য পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসরিয়াল ফেলো এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, যেহেতু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই, তাই তাদের বিশাল ভোটব্যাংক এবার কোন দিকে ঝুঁকবে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরিপের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো মানুষের ব্যাপক ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহ। তবে নির্বাচনের দিনের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি সন্তোষজনক না হয়, তবে সিদ্ধান্তহীন ওই ৮ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে নাও যেতে পারেন। পরিস্থিতি খারাপ হলে এই সংখ্যাটি ৮০ শতাংশেও রূপ
নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে ভোটের দিন কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সিআরএফ এর সহসভাপতি ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাবুল হক সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে মানুষের উৎসাহ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ, ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে মানুষের মনে এখনো উদ্বেগ বা টেনশন কাজ করছে। এই উদ্বেগ কেবল সাধারণ ভোটারদের নয়, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সমর্থকদের মধ্যেও বিদ্যমান ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *